শিরোনাম

রাজনীতি রাজনীতিবিদ কলুষিত, নাকি সমাজ ব্যবস্থা?

0

 

এফএম শরিফুল ইসলাম শরিফ

রাজনৈতিক পরিবারে আমার জন্ম। রাজনৈতিক কমর্কাণ্ডের মধ্যেই বেড়ে ওঠা। ২০০০ সাল, তখন আমি অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। আমাদের বাগেরহাট জেলার মোল্লাহাট থানাধীন ২ নং চুনখোলা ইউনিয়ন ছাত্রলীগের কাউন্সিল। এক প্রার্থীর পক্ষে গণসংযোগের মাধ্যমে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে আত্মপ্রকাশ। পর্যায়ক্রমে ইউনিয়ন ছাত্রলীগ, থানা ছাত্রলীগ, কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে। রাজনীতি করতে গিয়ে অনেক বাস্তবতার সম্মুখে নিজেকে পড়তে হয়েছে। দীর্ঘ চার বছর ৯ মাস বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের দায়িত্ব পালন করেছি। দেখেছি একটি ইউনিটের দায়িত্ব থাকলে মানুষ কীভাবে তাকে মূল্যায়ন করে।

আমি তখন ছাত্রলীগের সভাপতি, গ্রামের বাড়ি গিয়েছি-পরিচয়ে সে আমার চাচা আমার বাবার বন্ধু, আমাকে বললেন ‘বাবা শরিফ আমার ছেলেটাকে তোমার কলেজে ভর্তি করে দাও’। আমি বললাম চাচা আপনার ছেলে এসএসসি এবং এইচএসসিতে জিপিএ কত? চাচা আমাকে বললেন, ‘কি জিপিএ’? আমি বললাম, চাচা পাস নাম্বার কি আপনি জানেন? তিনি বললেন সে আমাদের স্কুলের আট নম্বর পর্যন্ত পড়ালেখা করেছে অর্থাৎ অষ্টম শ্রেণি।

চাচাকে আমি বললাম, চাচা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে হলে তাকে এসএসসি এবং এইচএসসি পাস করতে হবে। তারপর ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হবে। পাস করলে ভাইবা দিতে হবে পরবর্তীতে ভর্তি হতে হয়। চাচা আমাকে বললেন, এই ব্যাটা তুমি ওই কলেজের ভিপি, আমাকে এতো কারণ দেখাও, তুমি পারবে না এটা হলো নাকি! আমার কাছ থেকে টাকা নিতে পারবে না বলে আমার ছেলেকে ভর্তি করবে না। বলো কত টাকা লাগবে, তোমার কলেজে আমার ছেলেকে ভর্তি করবা। এটা তো বললাম আমার গ্রামের এক অবুঝ ও নিরক্ষর চাচার কথা।

এবার আসা যাক শিক্ষিত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এমনকি আমার সাংবাদিক বন্ধুরা, যারা দেখা হলেই বলে শরীফ ঢাকায় কোথায় কোথায় জায়গা কিনেছ, কয়টা ফ্ল্যাট কিনেছ। তাদের ধারণা বিশেষ করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি হওয়ার সাথে সাথেই সে কোটিপতি বনে যায়। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়টি পুরানা ঢাকার ব্যবসায়িক এলাকায় অবস্থিত। সদরঘাট, ইসলামপুর, তাঁতিবাজার, শাঁখারীবাজার, নয়াবজার যে জায়গায়গুলো বাংলাদেশের সমৃদ্ধ ব্যবসায়িক এলাকা হিসেবে সমাদৃত। সুতরাং যারা এবং আমার বন্ধুরা এসব উদাহরণ দিয়ে আমাকে মূল্যায়ন করতো তা নিজের কাছে বিব্রতকর মনে হতো। সাথে রয়েছে আবার ভর্তি বাণিজ্য, যা সম্পূর্ণ একটি ভ্রান্ত ধারণা। আমার নিজের বোন ইডেন কলেজে পড়ে ছোট ভাই ঢাকা কলেজ থেকে পাস করে পুলিশ অফিসার, এমনকি একটি বাস্তব ঘটনা আমার স্বচক্ষে বিদ্যমান, আমাদের মাননীয় উপাচার্য অধ্যাপক ড.মীজানুর রহমান স্যারের আপন ভাগ্নি এ ইউনিটে ওয়েটিং লিস্টে ছিল, সে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারেনি। কিন্তু সমাজে প্রচলন আছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি বাণিজ্য হয়। যার বিনিময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, ছাত্রনেতারা, গাড়ি-বাড়ির মালিক হয়, যা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ধারণা। সেই ধারণা থেকে এসব ব্যক্তিদের মূল্যায়ন করা হয়।

আমার বন্ধুরা মিলে কোন রেস্টুরেন্টে বসে খাবার খাচ্ছি, শেষে বিল দেওয়ার সময় হলো, বিল কে দেবে, পরিবেশটা এমন হয় বিলটা যেন আমি দেবো। কারণ আমি ছাত্রলীগের সভাপতি। ক্যাশ কাউন্টারে কেউ বিল দিতে গেলে ক্যাশিয়ার বলে ভাই দেবে, কেন ভাই দেবে এখানে তো বিসিএস ক্যাডার পুলিশ রয়েছে, এডমিন ক্যাডার রয়েছে, সাংবাদিক বন্ধুরাও রয়েছে, তাহলে আমি কেন বিলটা দেবো। আমরা কেন ভারতের কংগ্রেসের সাবেক সভাপতি রাহুল গান্ধীর মতো হতে পারি না। সে যেমন বন্ধুদের সবার কাছ থেকে চাঁদা নিয়ে বিলটা পারিশোধ করে।

ছাত্রলীগের সভাপতি দায়িত্ব অনেক, ঈদ বা পূজার সময় এসেছে, ছোট ভাইদের বিদায় দিতে হবে। তাদের ঈদের সালামি, পূজার আশীর্বাদ দিতে হবে। ঈদের কয়েকদিন আগ থেকেই ফোন। ভাই ঈদে বাড়ি যাবো বললাম যাও সে বলল ভাই সালামি দিবেন না, আমি বলি কিসের সালামি? সাংবাদিক ছোট ভাই বা বন্ধুরা বলে, ভাই কি বন্ধু বাড়ি যাবো, কাল আপনার সাথে দেখা করবো, কখন আসবো? তুমি বাড়ি যাবে আমার সাথে দেখা করার দরকার কি ভাই। বাড়ি থেকে এসে দেখা করিও, সে বলে না ভাই, কিংবা বন্ধু, ঈদের খরচ দিবেন না। আরে ভাই এটা আবার কোন প্রচলন। যাহোক বাধ্য হয়ে অনেক সময় অনেক কিছু করতে হয়।

সভাপতি থাকাকালীন অনেক সময় বর্তমান জেলহাজতে থাকা ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট ভাইয়ের অফিসে গিয়েছি। সম্রাট ভাই বললেন শরীফ কেমন আছিস, আমি বলি জ্বি ভাই ভালো। সম্রাট ভাই বলল বস পরিচয় হয়, এই আমার বন্ধু কর্নেল (–) নাম নাই বলি, মেজর, পুলিশের ডিসি, এডিসিসহ অনেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ,এমনকি অনেক সাংবাদিকেরাও বসা, যাদের অনেককে আমি নামে এবং সম্পর্কে চিনি। সবাই এসেছে ঈদের সালামি নেওয়ার জন্য। অথচ দেখেন এই কর্নেল এবং পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সম্রাট ভাইয়ের হাতে হাতকড়া পরিয়েছে। গ্রেফতার করেছে।

ছোটবেলায় ঈদের নামাজ পড়তে আমাদের গ্রামের ঈদগাহ যেতাম। নামাজ শেষে বন্ধুদের সাথে ঈদ উপলক্ষে মেলা বসতো সেখানে যেতাম। মেলার ভিতরে ছক্কা-পাঞ্জা আসর বসতো। যেটাকে আমরা এখন জুয়া হিসেবে জানি। যাহোক ৫ টাকা নিয়ে খেলা শুরু করলাম খেলতে খেলতে এক সময় দেখলাম ৭৫ টাকা জিতেছি। একপা-দুপা করে পিছাতে লাগলাম, যখন ফাঁকা জায়গায় বের হলাম, দিলাম এক দৌড়। দৌড় দিলাম এই কারণে জিতলে নাকি আরও খেলতে হয়। সম্রাট ভাই যা করেছে মাত্রারিক্ত করেছে। উনি ৭৫ টাকায় সীমাবদ্ধ থাকতে পারেনি। উনি জিতেছেন আরো জিততে চেয়েছেন। যার দরুন জীবনটা এখন জেলহাজতে। তাই কোন কিছু মাত্রারিক্ত ভালো না।

ছাত্র রাজনীতি ছেড়ে এখন আওয়ামী রাজনীতিতে ওয়ারী থানা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক, নিয়মিত নামাজ পড়ার চেষ্টা করি। বিশেষ করে জুম্মার নামাজ ওয়ারী নূর জামে মসজিদে বেশিরভাগ সময় পড়ি। নূর জামে মসজিদের একসময় স্পিকার নষ্ট হয়ে গেছে, হঠাৎ করে একজন বলে উঠল আমাদের নেতা শরিফ ভাই স্পিকার ঠিক করে দিবে। আরে ভাই আমি যদি দিবো বা আমার সামর্থ্য থাকে তাহলে আমিই তো বলব, এখানে তো অনেকেই আছে যারা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রির মালিক, ওয়ারী একটি অভিজাত এলাকা, শত নয় হাজার কোটি টাকার মালিক থাকে এই এলাকায়, এবং এই মসজিদে নামাজ পড়ে তবে আমাকে কেন, রাজনীতি করি বলে?

আপনি রাজনীতি করেন, আপনি রাজনীতিবিদ, কোন বিবাহের অনুষ্ঠানে যাবেন আপনার গিফট টা সবচেয়ে দামী হতে হবে, সুন্নাতে খৎনায় যাবেন ওখানে ও একই অবস্থা। জেহাপত অনুষ্ঠানে যাবেন আপনার চাঁদার পরিমাণ টা অনেকের চেয়ে বেশি হতে হবে, কুলখানিতে যাবেন বা কোনো সৎ কাজে যাবেন সবথেকে বেশি খরচ আপনাকে বহন করতে হবে। না হলে আপনি ভোটের রাজনীতিতে নেই।

আপনাকে কেউ ভোট দিবেনা। ভোট দিবে তাকে যে অপকর্ম করে রডের বদলে বাঁশ দিয়ে বা তিনশো টাকার ভিজিটের জায়গায় বারোশো টাকায় রোগী দেখেন বা ফাইল ঠেকিয়ে টাকা ইনকাম করেন। ইন্ডিয়ান বা চায়না প্রোডাক্টকে জাপানি বা জার্মানি বানিয়ে শতকোটি ইনকাম করে,কোটি টাকা নিয়ে নির্বাচনে দাঁড়িয়েছে, যে সকল আনুষ্ঠানিকতা সবার উপরে থাকে তাকে আপনি ভোট দিচ্ছেন। তাই আমি বলতে চাই আমাদের সমাজটাই কলুষিত হয়েছে।বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় সৎ রাজনীতিবিদ ও সৎ নাগরিক তৈরিতে বড় বাধা। শুধু রাজনীতিবিদদের নয় কিছু কিছু পেশার সাথে আমাদের সামাজিক মূল্যায়ন এমন হয়েছে যে সবই সত্য। যেমন ধরুন, পুলিশ ঘুষ খায়, রাজনীতিবিদরা চাঁদাবাজ, সাংবাদিকরা ফিটিংবাজ,শিক্ষক ফাঁকিবাজ আমলারা ফাইল ঠেকিয়ে টাকা দাবি করে। এইসব অপবাদ থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। যার যার জায়গা থেকে সুনামের সাথে এবং আদর্শনীতি এবং সততার সাথে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। বিশেষ করে রাজনীতিবিদ আপনাকে অবশ্যই আদর্শ নীতি এবং সততার সাথে কাজ করতে হবে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে রাজনীতিবিদদের যেমন কাজ বেশি তেমনি দায়িত্বও বেশি। আবার সেই কাজ এবং দায়িত্বের জন্য নেই কোন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা। অভিজ্ঞতাই আপনার একমাত্র সম্পদ। আপনার সিদ্ধান্তেই চলবে দেশ।

ধানমন্ডি ৩/এ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভানেত্রীর কার্যালয় অনেক জাতীয় নেতাদের সাথে বসে আছি। কথার পালাক্রমে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বিএম মোজাম্মেল হোসেন বললেন ‘রাজনীতিবিদদের কাজ কি’? তিনি আবার বললেন ‘২৪ ঘন্টার মধ্যে ২৩ ঘন্টা ৫৫ মিনিট বসে ও ঘুমিয়ে থাকা আর পাঁচ মিনিটের একটা সিদ্ধান্ত’। অর্থাৎ আপনি ওই পাঁচ মিনিটের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে আপনি কেমন রাজনীতিবিদ তা প্রমাণ পাবেন। আপনার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবে আমলারা, বিশ্লেষণ করবে জনগণ ও সাংবাদিকেরা সিদ্ধান্ত আপনার। আপনার সিদ্ধান্ত এখানেই, আপনি কি পাঁচ টাকা থেকে ৭৫ টাকা হলে পালিয়ে যাবেন, নাকি যেখানে এবং যে দেশের মদ-জুয়া ক্যাসিনো নিষিদ্ধ একের পর এক ক্যাসিনোর সংখ্যা বাড়িয়ে ৬০ টিতে রূপান্তর করবেন। রাজনীতিবিদদের অনেক কিছু করার এবং করতে পারার হাতছানি থাকে যেহেতু আমাদের সমাজে সব পেশা এবং সবকিছুর সমন্বয়ক রাজনীতিবিদ। সেহেতু আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আপনার মাধ্যমে দেশ ও সমাজের পরিবর্তন আসবে। ইতিহাস ঘেটে আমরা পেয়ে থাকি রাজনীতিবিদদের হাত ধরেই দেশ ও সমাজের পরিবর্তন এসেছে। তাই আপনাকেই শুদ্ধ হতে হবে সবার আগে।

বর্তমান জননেত্রী শেখ হাসিনা যে শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা করছেন সেটাকে সাধুবাদ জানাই। এতে করে বোঝা যাচ্ছে আইনের উর্ধ্বে কেউ নয়। অপরাধী সে যেই হোক অপরাধ করলে শাস্তি তাকে পেতেই হবে। যতই তার পাশে কর্নেল, মেজর, ডিসি, এডিসি বড় কর্মকর্তা থাকুক না কেন আপনার হাতে হাতকড়া পরবেই।শেখ হাসিনার শুদ্ধি অভিযানে রাজনীতিবিদরা আরো বেশি সচেতন এবং সতর্ক হবে বলে আমি আশা করি।

আমাদের সকলকে মিলে একসাথে নেত্রীর পাশে থেকে তার যেসকল উন্নয়নমূলক সিদ্ধান্ত রয়েছে তা বাস্তবায়ন করার জন্য অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। যেখানেই দুর্নীতি-অনিয়ম অপরাধ দেখা যাবে, সেখানেই প্রতিরোধ করতে হবে যার যার অবস্থান থেকে।

২০২১ সালের ভিতরে আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি। ২০৪১ সালের মধ্যে আমরা উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি। সেটি বাস্তবায়ন হবে আমাদের প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে। তাহলেই রাজনীতি না রাজনীতিবিদ নাকি সমাজ ব্যবস্থা কলুষিত এই প্রশ্নের প্রয়োজন হবে না।

 

লেখক : সাবেক সভাপতি, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ। সাংগঠনিক সম্পাদক ওয়ারী থানা আওয়ামী লীগ।

Print Friendly, PDF & Email

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.